শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৪৩ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে টিডিএসে খোলা হয়েছে শোক বই বেগম জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় ট্রাফিক স্কুলে দোয়া মাহফিল স্কুল অব লিডারশিপ এর আয়োজনে দিনব্যাপী পলিটিক্যাল লিডারশিপ ট্রেনিং এন্ড ওয়ার্কশপ চাঁদপুরে সাহিত্য সন্ধ্যা ও বিশ্ববাঙালি মৈত্রী সম্মাননা-২০২৫ অনুষ্ঠিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় টিডিএসে দোয়া মাহফিল সব্যসাচী লেখক, বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদী: সিলেট থেকে বিশ্ব সাহিত্যে কসবায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের পক্ষে নেতাকর্মীদের গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরন ৭ই নভেম্বর: সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এখন কবি আল মাহমুদের সময় দৈনিক ঐশী বাংলা’র জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন ১৭ জানুয়ারি-‘২৬ ঢাকার বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে
আধুনিক শিক্ষার পথিকৃৎ হাজী মহম্মদ মহসীন বিস্মৃতির অতলে

আধুনিক শিক্ষার পথিকৃৎ হাজী মহম্মদ মহসীন বিস্মৃতির অতলে

দীপক সাহা (পশ্চিমবঙ্গ)

রাজা রামমোহন রায়কে ভারতীয় জনজীবনের আধুনিকতার জনক বলা হলেও বস্তুত খুব নিবিড়ভাবে বিবেচনা করলে বোঝা যায় ভারতবর্ষে আধুনিকতার চিন্তার বিকাশে সলতে পাকানোর কাজটি করে গিয়েছিলেন হাজী মহম্মদ মহসীন। আক্ষেপের কথা, দেশকে আধুনিক বিজ্ঞানমুখী শিক্ষার প্রাথমিক ধারণা তৈরি করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের কথা আমরা ভুলতে বসেছি। বর্তমানে দেশের অস্থির চলাচলে দানবীর মহসীনের অসাম্প্রদায়িক মননের চর্চা আরও সামনের সারিতে আসা জরুরি। শিক্ষা পরিবেশে একপেশে সাম্প্রদায়িকরণ এবং সার্বিকভাবে যখন ভারতের মাটি ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিতে উন্মত্ত তখন হাজী মহম্মদ মহসীনের জীবন দর্শন বাংলা তথা সমগ্র দেশের কাছে এক অসাম্প্রদায়িক উজ্জ্বল উদাহরণ। অনেক মহাপুরুষ ও মনীষীর জন্মদিন, মৃত্যুদিন নিয়ে আমরা মাতামাতি করলেও নীরবে পেরিয়ে যায় দানবীর হাজী মহম্মদ মহসীনের জন্মদিন, মৃত্যদিন। তাঁর প্রতি বাঙালির সীমাহীন নীরবতা বড়োই হতাশার।

বাঙালি জাতির মুসলিম, হিন্দু সকলের কাছে সমান শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। দান, দয়া এবং মানবতার ইতিহাসে তিনি এক কিংবদন্তি পুরুষ। বাঙালি মুসলমানই শুধু নয়, সব ধর্মের মানুষের শিক্ষা ও সামাজিক, দাতব্য কর্মকাণ্ডে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি–সেই তালিকায় শীর্ষে থাকা একটি নাম হাজী মহম্মদ মহসীন। নিজের সকল সম্পত্তি দান করা, শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারে ব্যয় করার জন্য ‘দানবীর’ হিসাবে খ্যাতি পেয়েছেন হাজী মহাম্মদ মহসীন। তাঁর দয়া ও মহানুভবতার কথা আজও প্রচলিত আছে রূপকথার মত। তিনি রাতে সঙ্গে টাকা নিয়ে ছদ্মবেশে শহরের অলি-গলিতে ঘুরে বেড়াতেন। দীন-দুঃখী, অন্ধ, যাকে সামনে পেতেন তাকে মুক্ত হস্তে দান করতেন। অনেক অভাবী পরিবারের যাবতীয় ব্যয় সকলের অলক্ষ্যে বহন করতেন। তাঁর মত দয়ার সাগর পৃথিবীতে খুব কমই জন্মেছেন। অকৃতদার, অবৈষয়িক, প্রকৃত জনহিতৈষী মহসীনের জীবনে সেবাই মূল মন্ত্র। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের(১৭৬৯-৭০) সময় তাঁর দানের ওপর নির্ভর করে লক্ষ লক্ষ মানুষ অন্নাভাবজনিত মৃত্যু খেকে বেঁচে গিয়েছিল। উপমহাদেশের ইতিহাসের এই বিখ্যাত দানবীর মহাম্মদ মহসিন ১৭৩২ সালের ৩ জানুয়ারি হুগলিতে জন্মগ্রহণ করেন।

মহসীনের পূর্ব পুরুষরা অত্যন্ত ধনী ছিলেন। সুদূর ইরান থেকে বাংলায় আসা তাঁর বাবা হাজী ফয়জুল্লাহ ছিলেন একজন ধনী জায়গিরদার। মাতা জয়নব খানমেরও হুগলি, যশোর, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ায় প্রচুর জমি ছিল। তাঁর বোন মন্নুজানের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী হিসেবে মহসীন বোনের অগাধ সম্পত্তির মালিক হন। হাজী মহম্মদ মহসীন ছিলেন সংসারবিরাগী মানুষ। ঘর-সংসার, ধন -দৌলতের প্রতি তাঁর কোন লোভ ছিল না। তাই তিনি স্থির করলেন এই বিশাল সম্পত্তি তিনি মানবজাতির জন্য হিতার্থে ব্যয় করবেন। বিশাল সম্পদের মালিক হয়েও মহসীন ছিলেন খুব ধার্মিক ও নিরহঙ্কারী। তিনি সর্বদা সহজ সরল জীবনযাপন করতেন। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইমামবাড়া প্রাসাদে বাস করতেন না। ইমাম বাড়ির পাশে একটি ছোট কুটিরে বাস করতেন। আর কোরান শরীফ নকল করে যা পেতেন তা দিয়েই চলতেন। নিজ হাতে রান্না করে অধীনস্তদের সঙ্গে বসে খেতেন।

প্রাথমিক পর্যায়ে হাজী মহসীন গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্জন করেছেন। পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার জন্য রাজধানী মুর্শিদাবাদ যান। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি মাত্র ৩২ বছর বয়সে ১৭৬২ সালে ভ্রমণে বের হন। মক্কা, দিনা, কুফা, কারবালাসহ ইরান, ইরাক, আরব, তুরস্ক এমন নানা স্থান সফর করে দীর্ঘ ২৭ বছর পর তিনি দেশে ফিরে আসেন।

১৮০৬ সালে তিনি তাঁর প্রায় সমস্ত ভূ-সম্পত্তি একটি ওয়াকফ দলিলের মাধ্যমে দান করে যান। ‘মহসীন ফান্ড’ নামক তহবিল প্রতিষ্ঠা করেন। এই তহবিল ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, পেনশন, বৃত্তি ও দাতব্য কর্মকাণ্ডের জন্য বরাদ্দ করা হয়। এই ফান্ডের তহবিলে অবিভক্ত বাংলার একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত শিক্ষার একটি রেনেসাঁ শুরু হয়–বিশেষ করে অবহেলিত মুসলিম সমাজের জন্য। তাঁর মৃত্যুর পরে সেই ওয়াকফ সম্পত্তির পরিচালনা নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম শুরু হয়। ১৮৩৫ সালে সকল আইনি ঝামেলা মিটিয়ে তদানিন্তন সরকার মহসীন ট্রাস্টের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৮৩৫ সালেই এই ট্রাস্টের অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয় হুগলী মহসীন কলেজ। উল্লেখ্য এইটিই ভারতবর্ষের প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার কলেজ যেখানে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে যে-কেউ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতো। এর আগে ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজ ছিল শুধু ‘the sons of respectable Hindoos’ এর জন্য এবং ১৮১৮ ও ১৮২০ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর কলেজ ও বিশপস কলেজ ছিল খৃস্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অক্ষয়চন্দ্র সরকার, স্যার উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ভুবনবিশ্রুত বাঙালিরা সবাই এই হুগলী মহসিন কলেজের ছাত্র ছিলেন। অবশ্য ১৮৩৫ সালে ইংরেজ সরকার এর নাম হুগলী মহসীন কলেজ রাখলেও কোনও অব্যাখ্যায় কারণে দিনে দিনে মানুষের বলায় ও লেখায় এর নামটি দাঁড়ায় শুধু হুগলী কলেজ। ১৮৬০ সালের পরে কাগজপত্রে কিংবা সাইনবোর্ডে মহসীন নামটা উহ্য হয়ে যায়। ১৯৩৬ সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় কলেজটি মূল নামে ফিরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং সে দাবি অনুযায়ী সরকারিভাবে পুনরায় কলেজটির নাম হয় হুগলি মহসীন কলেজ।

হুগলী মহসীন কলেজ ছাড়াও চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মহম্মদ মহসীন কলেজ ও হাজী মহম্মদ মহসীন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় মহসীনের ওয়াকফকৃত অর্থ ব্যবহৃত হয়। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় পূর্ববঙ্গে গড়ে ওঠে দৌলতপুর মহসীন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হলের নাম তাঁর স্মরণে রাখা হয়েছে। হাজী মহম্মদ মহসিন ফান্ডের আর্থিক সহায়তায় ১৮৭৪ সালে ঢাকায় মোহসীনিয়া মাদ্রাসা (বর্তমান কবি নজরুল সরকারি কলেজ) প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর স্মরণে ‘মহসীন হল’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাটির নাম বিএনএস হাজী মহসীন।

মহসীন ট্রাস্ট তথা মহসীন এনডাওমেন্ট ফান্ড এর সৃষ্টি শুধু হুগলি মহসীন কলেজ নয়। হুগলিতে একটি হাসপাতাল নিয়মিতভাবে এই অর্থে চলছে। মহসীনের সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের অধিকাংশ জমি ছিল অবিভক্ত বাংলার যশোর ও খুলনায়। এই ট্রাস্ট এস্টেটের জমিতে অনেকগুলো দাতব্য হাসপাতাল, সরকারি অফিস, খুলনা-কলকাতা রেললাইন ছাড়াও গড়ে ওঠে অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। খুলনার দৌলতপুরের সরকারি ব্রজলাল কলেজের ৪২ একর জমির ৪০ একরই মহসিনের সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের জমি। ব্রজলাল কলেজের অনেক আগে ১৮৬৭ সালে মহসিন এনডাওমেন্ট ফান্ড এর অর্থে দৌলতপুরে তৈরি হয় একটি এ্যাংলো ভার্নাকুলার স্কুল। ১৯৩৯ সালে এর নামকরণ হয় দৌলতপুর মহসীন হাই ইংলিশ স্কুল। ১৮৮৬ সালে সরকারি অর্থে খুলনা জেলা স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু কিছুদিনেই স্কুলটি অর্থাভাবগ্রস্ত হয়ে পড়লে সরকারি সেই স্কুলটির জন্যও সরকার মহসীনের সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেট থেকে অর্থ মঞ্জুর করেন। এছাড়াও মহসীনের সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের অর্থে খুলনার দৌলতপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় মহসীন বালিকা বিদ্যালয়, ও মহসীন মহিলা কলেজ। ১৮৭৪ সালে মহসীন এনডাওমেন্ট ফান্ড এর অর্থে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে তিনটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকার মাদ্রাসাটি এখন সরকারি কবি নজরুল কলেজ ও চট্টগ্রামের মাদ্রাসাটি এখন হাজি মহম্মদ মহসীন কলেজ। আর রাজশাহির মাদ্রাসা এখন রাজশাহি গভর্নমেন্ট মাদ্রাসা।

শিক্ষানুরাগী মহসীনকে আমরা দানবীর বলে জানলেও তিনি যে একজন সঙ্গীতজ্ঞ ও গণিতশাস্ত্রবিদ ছিলেন তা হয়তো অনেকেই জানি না। ১৮১২ সালে ২৯ নভেম্বর ৮২ বছর বয়সে এই শিক্ষানুরাগী,সমাজসেবী, ধার্মিক দানবীর হুগলিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে হুগলির ইমামবাড়ায় দাফন করা হয়। ইতিহাসে দাতা হাজী মুহাম্মদ মহসীনের নাম চিরস্মরণীয়। কিন্তু খুবই দুর্ভাগ্যের, অবিভক্ত বাংলার শিক্ষার জগতে নিঃশব্দে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন এমন মহান ব্যক্তির জীবন ও দর্শন নিয়ে আজ আমাদের কোনোই চর্চা নেই, কোনোই আলোচনা নেই।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD